যে যত বড় ক্রিকেটার হোক, যতই প্রতিভা থাক, ধারাবাহিকভাবে যে যতই পারফর্ম করুক – ওটাই শেষ কথা নয়। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক হতে হতে ভারতীয় ক্রিকেট সমস্ত ক্রিকেটীয় যোগত্য়াকে দূরে ঠেলে অ্যাথলিটিসিজমের যোগত্য়াকে ভারতীয় দলে প্রবেশের মাপকাঠি হিসেবে বেছে নিচ্ছে। বাইশ গজে মাঠে নেমে যোগ্য়তা প্রমাণ করার দিন শেষ, ফিটনেস লেভেল মাপার সর্বোচ্চ মাপকাঠি ইয়ো-ইয়ো টেস্ট পাশ করলে তবেই বুক ফুলিয়ে নিজেকে ভারতীয় দলের ক্রিকেটার বলা যাবে। এবার থেকে ভারতীয় দলে জায়গা পেতে হলে এই টেস্ট পাশ করা যে বাধ্য়তামূলক, তা সরকারিভাবে জানিয়ে দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। বোর্ডের সিইও রাহুল জোহরি বলেছেন, চোট-আঘাতকে এড়িয়ে কেউ যদি পারফর্ম করে নিজেকে ফিট বলতে চান, তা আর মানা হবে না। নিজেকে কোনও ক্রিকেটার তখনই ফিট বলতে পারবেন, যখন তিনি ইয়ো-ইয়ো টেস্ট পাশ করবেন। তবেই ভারতীয় দলে জায়গা পাবেন।
একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্য়মকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিসিসিআই সিইও ব্য়াপারটি পুরোপুরি খোলসা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ”অধিনায়ক, কোচ এবং জাতীয় নির্বাচক মণ্ডলীর সদস্য়সহ প্রধান নির্বাচক দলের সাপোর্ট স্টাফ মানে ফিজিও ট্রেনারের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফিটনেস যোগ্য়তার মাপকাঠিকে সর্বোচ্চ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন থেকে দলে জায়গা পেতে হলে ফিটনেস যোগ্য়তার মাপকাঠি পাশ করতে হবে। এর সঙ্গে কোনওরকম আপস করা হবে না।”
বিসিসিআই সিইও’র বক্তব্য়, বর্তমানে ভারতীয় দলে যে ক্রিকেটাররা খেলছেন, মানে শ্রীলঙ্কা সফরে যে দলটি গিয়েছিল এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে যে দলটি সীমায়িত ওভারের সিরিজ খেলছে, সবাই ইয়ো-ইয়ো টেস্টে পাশ করে তবেই সুযোগ পেয়েছেন। এই টেস্টকে সারা বিশ্বে ফিটনেস লেভেলের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে ধরা হয়। বিসিসিআই এখন এই টেস্টকেই প্রাধান্য় দিতে চায় ভারতীয় দলে ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে। শুধু সীমায়িত ওভারের ক্রিকেট নয়, টেস্ট ক্রিকেটে ভারতীয় দলের জার্সি পরতে গেলেও, ক্রিকেটারদের ইয়ো-ইয়ো টেস্ট পাশ করার মতো ফিট হতে হবে এবার থেকে। শ্রীলঙ্কা আগামী মাসে ভারত সফরে আসছে, তার আগে সবাইকে ইয়ো-ইয়ো টেস্টের পরীক্ষার বসতে হবে বেঙ্গালুরুর জাতীয় অ্য়াকাডেমিতে।
একবারে জেনে নেওয়া যাক ইয়ো-ইয়ো টেস্ট ব্য়াপারটা ঠিক কি রকম? হাল্কা জগিং দিয়ে শুরু করে ফুসফুসের সমস্ত দমদিয়ে প্রানপনে দৌড়ে দৌড় শেষ করতে হবে। কুড়ি মিটার দূরত্বের নির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া হবে, তার মাঝে দু’বার দৌড়তে হবে, মানে শুরু থেকে শেষে গিয়ে আবার শেষ থেকে শুরুর জায়গায় আসতে হবে। এর পর্বের দুই দৌড়ের মাঝে তিনটি করে বিপ সাউন্ড আসবে দৌড় শুরু, টার্ন নেওয়া ও দৌড় শেষ করার জন্য়। বিপ সাউন্ড এক থেকে তিন নম্বরের দিকে যত এগোবে, সংশ্লিষ্ট অ্য়াথলিটকে চল্লিশ মিটার সার্কিটে তত জোরে দৌড়তে হবে। প্রথম বিপ সাউন্ড বাজার পর পরের দু’টি বাজার আগেই লক্ষ্য়তে পৌঁছতে হবে। দু’বার বিপ সাউন্ড আগে বেজে গেলে টেস্টে ফেল। ফাইনাল স্কোর নির্ধারণ করা হয় সংশ্লিষ্ট অ্য়াথলিট কটা ল্য়াপ পার করেছে এবং কতটা গতিতে পার করেছে, তার ওপর।
জোহরি বলছেন, ”ভারতীয় ক্রিকেটারদের এখন আপাতত বলা হয়েছে ইয়ো-ইয়ো টেস্টের বেসিক স্কোর পাশ করতে। আস্তে আস্তে এই স্কোর বাড়ানো হবে। বর্তমানে ভারতীয় দলে জায়গা পেতে হলে যে কোনও ক্রিকেটারকে ১৬.১ পয়েন্ট পেতেই হবে। এটা নাকি আন্তর্জাতিক মানের একজন এলিট খেলোয়াড়ের সেট করা স্ট্য়ান্ডার্ড সময়। সব ক্রিকেটারকেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এটা। যাঁরা এখন খেলছেন সবাই এই টেস্টে পাশ করেছেন। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে কয়েকজন ক্রিকেটারকে সময় দেওয়া হয়েছে, যাতে এই টেস্ট পাশ করার মতো ফিটনেস লেভেল তাঁরা বাড়াতে পারেন।”
আধুনিকতার সঙ্গে সব খেলাই আধুনিক হয়। আধুনিক প্রযুক্তিকে বেছে নেয়। তার যেমন ভালো দিক আছে, তেমন নেতিবাচক দিকও রয়েছে। আর সে ব্য়াপারে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছেন অনেকে। ভারতীয় দলে একসময় কোচিং স্টাফের সদস্য় হিসেবে কাজ করা এক ট্রেনার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলছেন, ”ইয়ো-ইয়ো টেস্টকে যোগ্য়তার সর্বোচ্চ মাপকাঠি হিসেবে গণ্য় করা ঠিক নয় দল নির্বাচনের জন্য। কারণ, এটা অ্য়ারোবিক্স নয়। খেলাটার নাম ক্রিকেট। এখানে দক্ষতাও লাগে সফল হতে গেলে। মানসিক কাঠিন্য় দরকার হয়। সেটা ইয়ো-ইয়ো টেস্ট দিয়ে যাচাই করা যায় না। ভারতীয় ক্রিকেটে বহু লেজেন্ড রয়েছেন, তাঁদের সময়ে এই টেস্ট যোগ্য়তা নির্ধারণের সর্বোচ্চ মাপকাঠি ধরা হলে, তাঁরা নিঃসন্দেহে ফেল করতেন।”
ভারতীয় ক্রিকেটে ইয়ো-ইয়ো টেস্টের আমদানি ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কা সফরের সময়। রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষণ ও সৌরভ গাঙ্গুলির মতো ক্রিকেটারদের কোনও দিন এই টেস্টের মুখে পড়তে হয়নি। ২০০৯ সালে ইয়ো-ইয়ো টেস্টের আগের ধাপ বিপ টেস্ট ভারতীয় ক্রিকেটে আসে। তখন ইয়ো-ইয়ো টেস্ট অ্য়ারোবিক্সের জন্য় নির্ধারিত ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাক্তন ক্রিকেটার বলছেন, ”ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড একটা মাপকাঠি ঠিক করে দিচ্ছে, এনিয়ে কোনও ভুল নেই। কিন্তু, মাথায় রাখাতে হবে, যে ক্রিকেটারদের এই টেস্টে পাঠানো হচ্ছে বা হবে, তাদের প্রস্তুত হওয়ার জন্য কতটা সময় দেওয়া হয়েছে। একগাদা ম্য়াচে অংশ নেওয়ার পর কোনও ক্রিকেটারের পক্ষে ফিটনেস লেভেল সবসময় একরকম রাখা সম্ভব নয়। ক্লান্তির ছাপ ফিটনেস লেভেলে ভারসাম্য়হীনতা আনবেই। এ ক’দিন আগেই অনূর্ধ্ব-১৯ টিমে খেলা এক ক্রিকেটারকে এই টেস্টে পাঠানো হলো অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টি-২০ ম্য়াচে সুযোগ দেওয়া হবে বলে।। সে ফেল করায় তাঁকে জাতীয় দলে জায়গা দেওয়া হলো না। অথচ সে দুর্দান্ত ফর্মে আছে। ভেবে দেখুন একবার ব্য়াপারটা, ওর সেই ফিটনেস লেভেল থাকবে কি করে! ছেলেটা তো একনাগাড়ে ক্রিকেট খেলে চলেছে গত ছয়-সাত মাস ধরে। তাছাড়া, এই ইয়ো-ইয়ো টেস্ট ঠিক কি, তাও তো ঠিকমতো বুঝিয়ে দিতে হবে। নাহলে অনেকেই শুরুতে প্রানপনে ছুটে দম শেষ করে ফেলছে। ফলে, পরের দিকে হাঁফিয়ে যাওয়ায় সময়ে দৌড় শেষ করতে পারছে না। তাকে বলা হচ্ছে, তুমি ফেল করে গিয়েছো। ফলে, জাতীয় দলে তোমার কোনও জায়গা হবে না। এই ব্য়াপারটা কখনই ঠিক নয়।”
এই ইয়ো-ইয়ো টেস্টে ফেল করাতেও দুই সিনিয়র ক্রিকেটার যুবরাজ সিং ও সুরেশ রায়নাকে ভারতীয় দলে জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। অথচ আশিস নেহরা আটত্রিশ বছর বয়সেও এই টেস্ট পাশ করেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের এক সিনিয়র ট্রেনর এপ্রসঙ্গে বলছেন, ”আশিস নেহরার পাশ করা নিয়ে তো অবাক হওয়ার কিছু নেই। ও তো চোট সারিয়ে সুস্থ হচ্ছিল। ফলে ওর শরীর সেই বিশ্রামটা পেয়েছে। ও জিমে কাটায় বেশিরভাগ সময়। ওর পক্ষে এটা কোনও ব্য়াপারই নয়।”
তবে, বিসিসিআই সিইও এই ইঙ্গিতও দিয়েছেন, ভারতীয় বোর্ড ভবিষ্য়তে ইয়ো-ইয়ো টেস্টের মতো আরও আধুনিক প্রক্রিয়া যোগ করবে ভারতীয় দলে জায়গা পাওয়ার জন্য় মাপকাঠি হিসেবে। জোহরি বলেন, ”ভারতীয় দলে খেলতে হলে, ইয়ো-ইয়ো টেস্টে পাশ করা এখন থেকে বাধ্য়তামূলক। ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করে টিম ম্য়ানেজমেন্ট ভবিষ্য়তে এরকম আরও অনেক মাপকাঠি যোগ করবে। তবে, সবই ধীরে ধীরে করা হবে। ক্রিকেটারদের বুঝে ওঠার মতো সময় দেওয়া হবে।”

  • SHARE
    A sports enthusiast and a critic. Journalism is all about being unbiased to create positive influence from negative angle.

    আরও পড়ুন

    আইপিএলে দল না পেয়ে বিধ্বংসী মার্টিন গাপ্তিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলড কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের মালকিন

    আইপিএলে দল না পেয়ে বিধ্বংসী মার্টিন গাপ্তিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলড কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের মালকিন
    আসন্ন আইপিএল ২০১৮র নিলামে দল পাননি তিনি। নিলামে অবিক্রীতই থেকে গেছিলেন নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপ্তিল। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুরন্ত...

    আইপিএল২০১৮: সম্পূর্ণ সূচী, ম্যাচের সময়, স্থান, এবং অন্যান্য বিবরণ

    মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আগামি ৭ এপ্রিল থেকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স এবং এই আইপিএলে নির্বাসন কাটিয়ে ফিরে...

    সারা তেন্ডুলকরের ফেক আইডি বানিয়ে এনসিপি প্রধানকে উত্যক্ত করার অপরাধে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তি

    সারা তেন্ডুলকরের ফেক আইডি বানিয়ে এনসিপি প্রধানকে উত্যক্ত করার অপরাধে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তি
    কিছুদিন আগেই ভারতের কিংবদন্তী ক্রিকেটের শচীন তেন্ডুলকরের মেয়ে সারা তেন্ডুলকরের মেয়েকে উত্যক্ত করার অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন পশ্চিম...

    সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারত অধিনায়ক বিরাটকে অপমান করলেন কপিল শর্মা

    সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারত অধিনায়ক বিরাটকে অপমান করলেন কপিল শর্মা
    ফের বিতর্কে কমেডিয়ান কপিল শর্মা। এবার তিনি সরাসরি অপমান করলেন ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে। যার ফলে রাগে...

    ভারত দক্ষিণ আফ্রিকা একদিনের সিরিজ: চতুর্থ ওয়ান ডে চলাকালীন বর্ণবিদ্বেষের শিকার দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটার

    ভারত দক্ষিণ আফ্রিকা একদিনের সিরিজ: চতুর্থ ওয়ান ডে চলাকালীন বর্ণবিদ্বেষের শিকার দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটার
    ভারত দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে ওয়ান ডে সিরিজ চলাকালীনই ঘটে গেল এক অপ্রীতিকর ঘটনা। জোহানেসবার্গের চতুর্থ ওয়ান ডে...