পূর্বে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশ কিছু সময় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, একটি বা দুটি দল ২৪ ঘণ্টা বা তার কিছু বেশী/কম সময়ের ব্যবধানে দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে (অবশ্যই এখানে একটিমাত্র টেস্টের কথা বলা হচ্ছে না, যেখানে ৫ দিন ব্যাপী ক্রিকেট খেলা হয়ে থাকে)। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উভয় দিনের ম্যাচের স্থান থাকে অপরিবর্তিত।

কি করতে চলেছে অস্ট্রেলিয়া?

তবে এবারে অস্ট্রেলিয়া করতে চলেছে এক বিরলতর কাজ, যেখানে তারা ২৪ ঘণ্টারও কম ব্যবধানে দুটি ভিন্ন মহাদেশের মাঠে দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে। অন্যভাবে বলা যায়, পরপর দু’দিনে দুটি ভিন্ন মহাদেশের মাটিতে দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে অস্ট্রেলিয়া।

আগামী ২৩শে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মাটিতে শুরু হতে চলেছে ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ার ৪-ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম টেস্ট ম্যাচ, যা ঐদিন ভারতীয় সময় সকাল ৯টা ৩০মিনিটে শুরু হবে পুনে শহরের মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে। আবার ঠিক তার পূর্ববর্তী দিন অর্থাৎ আগামী ২২শে ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া নিজের দেশের মাটিতে খেলবে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ৩-ম্যাচের টি-২০ আন্তর্জাতিক সিরিজের শেষ ম্যাচটি, যা শুরু হবে ভারতীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ওভালের মাঠে।

বলা বাহুল্য যে, অস্ট্রেলিয়া দলের দুটি সম্পূর্ণ পৃথক একাদশ সমেত প্রাথমিক দল থাকবে এই দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে। তবে যাই হোক না কেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা যেখানে একটি দল পরপর দু’দিনে দুটি ভিন্ন মহাদেশের মাটিতে দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলছে।

এবার আসা যাক তাহলে ক্রিকেট ইতিহাসের বিরলতম ঘটনাটির কথায়, যা অস্ট্রেলিয়ার ঘটনাটিকেও ছাপিয়ে যাবে। একই দিনে বিশ্বের দুটি ভিন্ন মহাদেশের মাটিতে দুটি ভিন্ন টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল একটি দেশ (দুটি ভিন্ন দলের বিরুদ্ধে)। বলতে পারবেন কারা এই কাজটি করেছিলেন?

পূর্ববর্তী সময়ে কারা এই কাজটি করেছিল এবং কবে?

তাঁরা হল ক্রিকেটের জনক নামে পরিচিত ইংল্যান্ড। ১৯৩০ সালের একেবারে প্রথমদিকেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং নিউজিল্যান্ড সফর করে ইংল্যান্ড। উভয় সফরেই ইংল্যান্ড খেলেছিল ৪-টি টেস্ট, যেখানে দুটি টেস্টের দিনক্ষণ পড়েছিল প্রায় একইদিনে।

নিউজিল্যান্ড সফরে ইংল্যান্ডের প্রথম টেস্ট শুরু হয়েছিল ১০ই জানুয়ারিতে, যা চলেছিল ১১ই এবং ১৩ই জানুয়ারি পর্যন্ত (১২ই জানুয়ারি রবিবার থাকায় সেটি ছিল বিশ্রাম দিন; তৎকালীন টেস্ট ক্রিকেটে প্রায়ই রবিবার-কে বিশ্রাম দিন হিসেবে গণ্য করা হত)। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর শুরু হয়েছিল ১১ই জানুয়ারিতে, যা চলেছিল পরবর্তী ১৩ই, ১৪ই, ১৫ই এবং ১৬ই জানুয়ারিতে (১২ই জানুয়ারি রবিবার থাকায় সেটি ছিল বিশ্রাম দিন)।

তবে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট ম্যাচের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ১১ই জানুয়ারি বৃষ্টির জন্য কোনো খেলা হওয়া সম্ভব হয়নি; যা ছিল আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট ম্যাচের প্রথম দিন। তাই ১৩ই জানুয়ারি ছিল এমন একটা দিন যেখানে ইংল্যান্ড একই দিনে দুটি আলাদা মহাদেশে দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল।

পরবর্তীকালে নিউজিল্যান্ড সিরিজের চতুর্থ তথা শেষ টেস্ট (২১, ২২ এবং ২৪শে ফেব্রুয়ারি) এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের তৃতীয় টেস্ট (২১, ২২, ২৪, ২৫ এবং ২৬শে ফেব্রুয়ারি) শুরু হয়েছিল একই দিনে। তাই ২১, ২২ ও ২৪শে ফেব্রুয়ারিতেও ইংল্যান্ড একই দিনে দুটি আলাদা মহাদেশে দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল। ২৩শে ফেব্রুয়ারি রবিবার হওয়ায় উভয় টেস্টেই সেটি ছিল বিশ্রাম দিন।

তবে উভয় মহাদেশের দুরত্ব বিশাল হওয়ার দরুন, সময়ের বিশাল তারতম্য দেখা যায়। এ ছাড়া আবহাওয়ার কারণের জন্যও একইদিনে টেস্ট ম্যাচ খেলা হলেও অধিকাংশই তা একই সময় পড়েনি। তবে মাত্র একটিবারই কিছু সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই বিরলতম ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে ইংল্যান্ড একই সময় দুটি ভিন্ন মহাদেশে দুটি ভিন্ন টেস্ট ম্যাচ খেলছিল।

আর সেটি ছিল নিউজিল্যান্ড সিরিজের চতুর্থ তথা শেষ টেস্টের দ্বিতীয় দিনের শুরুর সময় (২২শে ফেব্রুয়ারি), যখন অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টের প্রথম দিনের শেষ সেশনটিও চলছিল (তখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজে ২১শে ফেব্রুয়ারি)। প্রায় দু’ঘণ্টারও কম সময় স্থায়ী ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই বিরলতম ঘটনাটি, যা আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্বিতীয়বারের জন্যও ঘটেনি।

ইংল্যান্ডের এই কৃতিত্বের পিছনে কারণ কি?

আসলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন দলগুলিকে তুলে ধরতেই ইংল্যান্ড এই কান্ড ঘটিয়েছিল। নিউজিল্যান্ড সফরের প্রথম টেস্টটি ছিল নিউজিল্যান্ডের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ, যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের প্রথম টেস্টটি ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে প্রথম টেস্ট ম্যাচ। এই সিরিজের মাত্র দু’বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চতুর্থ দল (ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পর) হিসেবে আবির্ভাব ঘটিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং তাদের প্রথম সিরিজটিও ছিল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের মাটিতে (যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল)।

১৯৩০ সালের শুরুর দিকের উভয় সফরেই দুটি পৃথক ইংল্যান্ড দল পাঠিয়েছিল এমসিসি (তৎকালীন ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের নিয়ন্ত্রক এবং দলকে বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিত; ১৯৯৬ সালে ইসিবি গঠন হওয়ার পূর্বে তাঁরাই ছিল ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের নিয়ন্ত্রক)।

নিউজিল্যান্ড সফরের দলটি ছিল মূলত তারুণ্যে নির্ভর, যেখানে মোট ৬জন ইংল্যান্ড ক্রিকেটারের অভিষেক ঘটে সিরিজের প্রথম টেস্টে। এই সফররত দলের মধ্যে একজন ছিলেন ভারতে জন্মগ্রহণকারী কুমার শ্রী দুলিপসিংজি (কুমার শ্রী রণজিত সিংহ-র ভাইপো, যার নামের স্মরণে ভারতের ঘরোয়া আঞ্চলিক প্রথম শ্রেনী ক্রিকেট টুর্নামেন্টের নামকরণ হয়েছে ‘রঞ্জি ট্রফি’), যার নামের স্মরণে ভারতের ঘরোয়া ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রথম শ্রেনী ক্রিকেট টুর্নামেন্টের নামকরণ হয়েছে ‘দুলিপ ট্রফি’। পুরো সিরিজটিতেই দলের নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন সিরিজের প্রথম টেস্টে অভিষেককারী হ্যারল্ড গিলিগান।

কুমার শ্রী দুলিপসিংজি

অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি বেশ শক্তিশালী হওয়ায়, ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দলটি ছিল বেশ অভিজ্ঞ। তবে সিরিজের প্রথম টেস্টে ইংল্যান্ডের দু’জন ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটান যার মধ্যে একজন ছিলেন ঐ সিরিজে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ফ্রেড্ডী কালথ্রপ।

সিরিজদ্বয়ের ফল

সিরিজদ্বয়ের ফল জানানোর আগে বলে রাখা উচিত যে, উভয় সিরিজ-ই ছিল ৪-ম্যাচের তবে নিউজিল্যান্ড সিরিজের প্রতিটি টেস্ট ম্যাচই ছিল ৩-দিনের (বিশ্রাম দিন ব্যতীত) যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রথম তিনটি টেস্ট ছিল ৫-দিনের (বিশ্রাম দিন ব্যতীত) এবং শেষ টেস্টটি ছিল একটি টাইমলেস টেস্ট।

নিউজিল্যান্ড সিরিজের প্রথম টেস্টটিতে ইংল্যান্ড অনায়াসে ৮ উইকেটে জয়লাভ করে। সিরিজের পরবর্তী ৩টি টেস্ট-ই অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়। ফলস্বরূপ, ইংল্যান্ড ৪-ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে।

অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের প্রথম ও শেষ টেস্টটি ড্র হয়, যেখানে ইংল্যান্ড সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটি জেতে ১৬৭ রানে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টটি জেতে ২৮৯ রানে। সবশেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড সিরিজের ফল দাঁড়ায় ১-১।

  • SHARE

    আরও পড়ুন

    সিরিজ হারের মূল্য চোকাতে হল ভারতকে আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে, এখন এটা হল ভারতের ওয়ানডে র্যা ঙ্কিং

    সিরিজ হারের মূল্য চোকাতে হল ভারতকে আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে, এখন এটা হল ভারতের ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিং
    ভারত আর ইংল্যান্ডের মধ্যে মঙ্গলবার সম্পন্ন হওয়া তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের সঙ্গেই আইসিসি ওয়ানডে সিরিজের সাম্প্রতিক র্যালঙ্কিং...

    ভারতীয় দলের এই দুই ক্রিকেটারকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় নি, তীব্র অভিযোগ করলেন সৌরভ গাঙ্গুলী

    ভারতীয় দলের এই দুই ক্রিকেটারকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় নি, তীব্র অভিযোগ করলেন সৌরভ গাঙ্গুলী
    ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ফলাফলে হারের পর ভারতীয় দলের টিম ম্যানেজমেন্টের কড়া সমালোচনায় মুখর হলেন ভারতীয়...

    মহেন্দ্র সিং ধোনির মন্থর ব্যাটিং নিয়ে এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া দিলেন প্রাক্তন ভারতীয় জোরে বোলার জাহির খান

    মহেন্দ্র সিং ধোনির মন্থর ব্যাটিং নিয়ে এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া দিলেন প্রাক্তন ভারতীয় জোরে বোলার জাহির খান
    টি২০ সিরিজ জিতে দুর্দান্তভাবে ইংল্যান্ড সফর শুরু করা ভারতীয় দলকে ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ফলাফলে হারের মুখ দেখতে...

    ইংল্যান্ড সফরে ব্যর্থ এই ক্রিকেটার, সৌরভ গাঙ্গুলী জানালেন এই ক্রিকেটারকে যত দ্রুত সম্ভব বাদ না দিলে বিশ্বকাপ হারতে পারে ভারত

    ইংল্যান্ড সফরে ব্যর্থ এই ক্রিকেটার, সৌরভ গাঙ্গুলী জানালেন এই ক্রিকেটারকে যত দ্রুত সম্ভব বাদ না দিলে বিশ্বকাপ হারতে পারে ভারত
    ২০১৯ বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি আর মাত্র কয়েকটা মাস, তার আগে ইংল্যান্ড সফরে ওয়ানডে সিরিজে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের...

    বিগ ব্যাশ লীগের অষ্টম অ্যাডিশনের সময়সূচি প্রকাশ করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

    প্রতিবছরের মত এবারো ডিসেম্বর মাসেই শুরু হতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় ঘরোয়া টি-২০ বিগ ব্যাশ লীগ(বিবিএল)। আট দলের...