উপরের হেডিংটা পড়েই পাঠকদের একটু অন্য়রকম লাগাটা স্বাভাবিক। এই প্রতিবেদন পাঠকদের এক অন্য় গল্প শোনানোর জন্য়। এই গল্পে ইচ্ছে আছে, জেদ আছে আবার অনুপ্রেরণাও আছে। এক ক্রিকেটারের জীবন নিয়ে এই গল্পকথা। কিভাবে, নিতান্ত এক সামান্য় পরিবার থেকে খবরের কাগজের শিরোনামে আসা। তারপরেও অসীম লড়াই আর লড়াই প্রতিটা পদে পদে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে। সেই স্বপ্নটাকে অন্য়দের মধ্য়ে ছড়িয়ে দিতে।

মহম্মদ সামি। ভারতীয় ক্রিকেট দলে খেলার সুবাদে, এখন এই নামটা বেশ পরিচিত হয়ে গিয়েছে। মনের জোর আর অদম্য় ইচ্ছে থাকলে একটা মানুষ কতদূর নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন, সামি তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এই বাঙলার মাটি থেকে উত্থান হলেও শিকড়টা কিন্তু বহদূর পর্যন্ত ছড়ানো। উত্তরপ্রদেশের এক প্রত্য়ন্ত গ্রাম সাহরানপুরের ছেলে হলেও পারিবারিক সূত্র জম্মু-কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের সঙ্গে জোড়া। বাবা তৌসিফ আলি ওখানকার। বহুদিন আগেই উত্তরপ্রদেশে চলে আসেন তিনি। চাষবাস করে সংসার চালাতেন। এমন এক জায়গায় সামির জন্ম যেখানে ক্রিকেট পিচ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যেদিকেই নজর যায়, সেখানেই চাষের ক্ষেত, কোথাও চাষ হচ্ছে আর নাহলে ফাঁকা। বিদ্য়ুৎ এলেও দিনে আটঘণ্টা বরাদ্দ ছিল।

তৌসিফ আলি সংসার টানতে চাষবাসে নেমে পড়ার আগে নিজে একসময় ক্রিকেট খেলতেন। ফাস্ট বোলিং করতেন। তবে, সবটাই রাজ্য়স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে, রক্তে ক্রিকেট রয়েছে। ফাস্ট বোলিংয়ের প্রতি ভালোবাসাটা বাবার থেকেই পাওয়া। তৌসিফের আরও এক মেয়ে ও তিন ছেলে রয়েছে। ২০০৫ সালে যখন পনেরো বছর বয়স, সে সময় সামির মধ্য়ে ফাস্ট বোলার হয়ে ওঠার প্রতিভা তৌসিফই লক্ষ্য় করেন। প্রতিভা নষ্ট না করে সাহরানপুর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মোরাদাবাদে ক্রিকেট কোচ বদরুদ্দিন সিদ্দিকির কাছে নিয়ে যান তিনি।

একসময় এক সাক্ষাৎকারে সামিকে প্রথম দিন দেখার কথা শুনিয়েছিলেন বদরুদ্দিন। সেই কথাটা আরেকবার শুনে নেওয়া যাক। পনেরো বছরের ওই ছেলেটাকে যখন নেটে প্রথম দিন বল করতে দেখি, তখনই বুঝেছিলাম এই ছেলেটার মধ্য়ে বিশেষ কিছু ব্য়াপার আছে। ছেলেটা সাধারণ মাপের মোটেই নয়। আমি তখনই ঠিক করে নিই, একে আমি ভালো ফাস্ট বোলার তৈরি করব। তখন আমাদের ওখানে ক্লাব ক্রিকেটের প্রচলন ছিল না। তাই ওকে একবছর ধরে ঘঁষেমেজে তৈরি করেছিলাম, ইউপি ট্রায়ালের জন্য। ছেলেটা খুব খাটতে পারে। একদিনও ছুটি নেয়নি। নিয়ম করে রোজ প্র্য়াক্টিসে আসত। কোনও দিন না করেনি। যা বলেছি, তাই শুনেছে। অনূর্ধ্ব-১৯ ট্রায়ালে ও ভালো বল করে। কিন্তু, ওকে সিলেক্ট করা হয়নি। কারণ, ওই নোংরা রাজনীতি। আমাকে বলা হয়েছিল, ওকে পরের বছর নিয়ে আসতে। তবে, আমি চাইনি, প্রতিভাটা ওভাবে নষ্ট হয়ে যাকে। ওর বাবা-মাকে বলেছিলাম, ওকে বাংলাতে পাঠিয়ে দিতে।

এমনটা নয় যে এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর আরও লড়াই শুরু। জীবনটাই যেন সংগ্রামে ভরা। বাবা-মাকে ছেড়ে কলকাতায় একাই চলে আসেন। ময়দান চত্বরে ক্লাব তাঁবুতে শুয়েই রাতটা কাটিয়ে দিতেন। মাথার ওপর ছাদও ছিল না। তবে, হার মানেননি। লড়ে গিয়েছিলেন। সকাল হলেই নেটে চলে আসা। দুপুরে নতুন বল নিয়ে প্র্য়াক্টিসে লেগে পড়া। আবার নেটে শেষ বলটিও নিজেই ফেলবেন, এমন অদম্য় জেদ। জাতীয় দলে অভিষেকের লগ্নে সেই জেদটাই দেখেছিল, ক্রিকেট দুনিয়া। ২০১৩ সালে ৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দিল্লি ম্য়াচে একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হয় সামির, সেদিন চারটি মেডেন ওভার করেছিলেন তিনি, যা এক রেকর্ড।

টাকার লোভ কোনও দিনই সামির মধ্য়ে ছিল না। ক্রিকেটের বাইশ গজে আজ তাই তিনি নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারছেন। কলকাতায় আসার পর ডালহাউসি অ্য়াথলেটিক ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পান। সিএবির প্রাক্তন সচিব দেবব্রত দাসের নজরে পড়ে যান সেই সময়। প্রতিভা কোনও দিন লুকিয়ে থাকে না। দেবব্রত দাস তাঁর দল টাউন ক্লাবে পঁচাত্তর হাজার টাকার চুক্তিতে সামিকে নিয়ে আসেন। থাকার জায়গা নেই শুনে নিজের বাড়িতে এনে রাখেন। টাউন ক্লাবের হয়ে ভালো বল করার পরও বাংলা অনূর্ধ্ব-২২ দলে নির্বাচিত না হওয়ায় দেবব্রত দাস এরপর সামিকে নিয়ে সেই সময়কার বাংলা দলের অন্য়তম নির্বাচক সম্বরণ ব্য়ানার্জীর কাছে যান। সামির সিম বোলিং দেখতে বলেন। অফ-স্টাম্পের বাইরে থেকে ভেতরে দিকে ঢুকে আসা আপরাইট সিম বোলিং দেখে সঙ্গে সঙ্গে বাংলা অনূর্ধ্ব-২২ দলে তাঁকে নিয়ে নেন তিনি। দেবব্রত দাসের কল্য়াণেই মোহনবাগান ক্লাবে যোগ দেওয়া এবং সৌরভ গাঙ্গুলিকে ইডেনে বল করতে গিয়ে বিশেষ নজরে পড়া। ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সেদিন সামিকে দেখে বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। তরুণ প্রতিভাটি যাতে না হারিয়ে যায়, তাই সিএবি কর্তাদের বিশেষ নজর দিতে বলেছিলেন দাদা। এরপর বাংলা রঞ্জি টিমে চান্স আসে সামির।

বাংলা টিমের হয়ে ভালো বল করেও জাতীয় দলে খেলার সুযোগ আসছিল না। পূর্ব ভারতের এই রাজ্য় থেকে ক্রিকেটের রাজপথে যেতে হলে অনেকটাই স্ট্রাগল করতে হয়। কিন্তু, হার মানেননি সামি। ফাস্ট বোলারের জীবন মানেই তো লড়াই করা। ২০১৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে যখন টেস্ট খেলার সুযোগ এলো সেই অদম্য় জেদটাই যেন বাড়তি তাগিদ এনে দিয়েছিল। প্রথম ইনিংসে চার উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট। ভারতীয় দলে বহুদিন পর একটা অভাব মিটল। একজন ভালো রিভার্স সুইং বোলার, যিনি নতুন বলে ফায়দা লোটার পর পুরনো বলেও উইকেট তুলে নিতে জানেন ব্য়াটসম্য়ানকে বিব্রত করে।

মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নটাও পূরণ হয়ে গিয়েছে। চোট-আঘাত থাকলেও, সেই যন্ত্রণা উপেক্ষা করে খেলে যান। ভারত সেমি-ফাইনাল পর্যন্ত যায়। আর গোটা টুর্নামেন্ট ১৭টি উইকেট তুলে নেন সামি। গড় ১৭.২৯, ইকোনমি রেট ৪.৮১। হাঁটুতে মজ্জা শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে খেলে যাওয়ার ফলও পেয়েছিলেন তিনি। ভারতের হয়ে বিশ্বকাপে ২০১৫ সালে দ্বিতীয় সেরা উইকেট সংগ্রহকারী ছিলেন তিনি। বিশ্বকারে শেষে হাঁটুর অপারেশন করানো এবং ক্র্য়াচে ভর দিয়ে ঘোরা, সেরে ওঠার সময়টা। তাঁর স্ত্রী আবার ওই সময় গর্ভবতী হয়ে ওঠেন।

চোট সারিয়ে জাতীয় দলে ফেরার পর সামির জীবনে আবার এক সংগ্রামের মুহূর্ত আসে। নিউজিল্য়ান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের টেস্ট ম্য়াচ চলার সময় তাঁর চোদ্দো মাসের ছোটো মেয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আয়রাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। প্রচণ্ড জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করতে হয়েছিল। ভারতের হয়ে টেস্ট ম্য়াচ খেলতে ব্য়স্ত থাকায় মেয়ের পাশে থাকতে পারেননি। টেস্ট ম্য়াচ চলাকালীন দিনের খেলা শেষে সন্ধেবেলাতে মেয়ের কাছে রোজ ছুটে যেতেন হাসপাতালে। সকালে আবার ভারতীয় দলের হয়ে দেশের জন্য় মাঠে নামতেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে আঠারো ওভার বল করে তিনটি করে উইকেট তুলেও নিয়েছিলেন। চুপচাপ থাকা মহম্মদ সামির পুরো জীবনটাই সংগ্রামে ভরা।

ক্রিকেটের জন্য় পুরো জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া সামিকে এখন জাতীয় দলে লড়াই করার পাশাপাশি নিজের পরিবার নিয়েও লড়াই করছেন। মেয়ের জন্মদিন পালন উপলক্ষ্য়ে  মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ছবি তুলে সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট ট্য়ুইটারে পোস্ট করায়, তাঁর ধর্মের কিছু গোঁড়া মানুষ কটু মন্তব্য় করে। তাঁর স্ত্রীকে শরীর ঢাকা পোশাক পরার পরামর্শ দিয়েছে তারা। দেশের হয়ে সামি যখন খেলতে নামেন, মনে তখন অন্য় লড়াই চলে। বহুদূরে পরিবারটা যে কলকাতায় একা পড়ে আছে। ধর্মীয় গোঁড়া মানুষদের থেকে নিজেদের বাঁচাতে লড়াই করে যাচ্ছে। এটাই যেন জীবন। লড়াই করে যাঁদের নিজেদের গড়তে হয়, সারা জীবন যেন কোনও না কোনও লড়াইতেই কাটিয়ে দিতে হয়। তবে, উত্তরপ্রদেশের ওই ছোটো গ্রাম থেকে ক্রিকেটের বাইশ গজের যে সফর সামি পার করেছেন, তা নিঃসন্দেহে যে কোনও গরীব ঘরের ছেলেকে ক্রিকেট খেলতে উৎসাহ যোগাবে।

  • SHARE

    আরও পড়ুন

    ২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে কেন অবসর নেওয়া উচিত হবে না ধোনির?

    মহেন্দ্র সিং ধোনি - ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। তাঁর নেতৃত্বে আইসিসির বড় সব...

    রিপোর্ট: বিসিসিআইয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্র লীক করলেন খবর, শেষ দুই টেস্ট থেকে এই ৩ খেলোয়াড়কে করা হবে বাইরে

    রিপোর্ট: বিসিসিআইয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্র লীক করলেন খবর, শেষ দুই টেস্ট থেকে এই ৩ খেলোয়াড়কে করা হবে বাইরে
    লর্ডস টেস্টে ভারতীয় দল ইনিংসে এবং ১৫৯ রানের এক লজ্জাজনক হারের সম্মুখীন হতে হয়। ভারতীয় দল এই...

    ইংল্যান্ড বনাম ভারত: জসপ্রীত বুমরাহ হলেন তৃতীয় টেস্টের জন্য ফিট, সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকেরা প্রকাশ করলেন খুশি

    ইংল্যান্ড বনাম ভারত: জসপ্রীত বুমরাহ হলেন তৃতীয় টেস্টের জন্য ফিট, সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকেরা প্রকাশ করলেন খুশি
    ভারত আর ইংল্যান্ডের মধ্যে চলতি পাঁচ টেস্টের সিরিজের প্রথম দুটি টেস্টে ভারতকে ইংল্যান্ডের হাতে লজ্জাজনক হারের সম্মুখীন...

    ইংল্যান্ড বনাম ভারত—ইংল্যান্ডের ভারতের উপর কটাক্ষ, জানাল ইংরেজদের সামনে এখনও বাচ্চা ভারতীয় দলের বড় হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে

    ইংল্যান্ড বনাম ভারত—ইংল্যান্ডের ভারতের উপর কটাক্ষ, জানাল ইংরেজদের সামনে এখনও বাচ্চা ভারতীয় দলের বড় হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে
    ভারতীয় দলকে ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে চলা পাঁচ টেস্ট ম্যাচের টেস্ট সিরিজের লর্ডসে খেলা দ্বিতীয় টেস্টে লজ্জাজনক হারের সম্মুখীন...

    ব্রেকিং নিউজ: শচীনের এই বিশেষ বন্ধু হলেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের হেড কোচ

    ব্রেকিং নিউজ: শচীনের এই বিশেষ বন্ধু হলেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের হেড কোচ
    বিসিসিআই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে একজন ভালো কোচের সন্ধান করছিল। এর মধ্যেই বড়...