ব্য়াটসম্য়ান ধোনি ভারতের সর্বকালের সেরা চতুর্থ রান শিকারী, তাঁকে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপ কি করে সম্ভব? 1

দেখতে দেখতে চোদ্দো বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাটিয়ে ফেললেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। তাঁর সেই লম্বা চুলের হেয়ার স্টাইল এখনও সেদিনকার কথা মনে হয়। টি-২০ বিশ্বকাপ জেতার পর হেয়ার স্টাইল চেঞ্জ। ছোটো চুলে মাহিকে দেখতে অভ্য়স্ত হতে না হতেই চারটে বছর কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল। আবার একটা বিশ্বকাপ, আবার হেয়ার স্টাইল চেঞ্জ। আটাশ বছর পর ভারতবাসীর খিদের ক্ষরা মিটিয়ে ন্য়াড়া মাথা হয়ে বসলেন ধোনি। এরপর নানা উত্থান-পতন দেখতে দেখতে ছয় বছর পেরিয়ে গিয়েছে। মাঝে আবার ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ জেতার অনেক কাছে চলে গিয়েও সেমি-ফাইনালে দৌড় শেষ। না হলে আরও একটা বিশ্বকাপ আসত ভারতের কাছে। যাক, সব আশা তো আর পূরণ হয় না। আর ধোনি ভারতীয় ক্রিকেটকে দেননি, এমন কোনও জিনিসই নেই। ফলে, আক্ষেপটা আসবে কোথা থেকে? মানুষটাকে লোকে এমনিই ভালোবাসে। আবার অনেকে তাঁকে সহ্য় করতে পারেন না। এটা ভারতবর্ষ, এখানে কিছু মানুষ কোনও একজনকে সফল মানুষকে পছন্দ করেন না। কারণ, মানুষটা যা দিতে চেয়েছেন, তাই দিয়েছেন। অনেকের পছন্দের ক্রিকেটার বা অধিনায়ককে ধোনি ছাপিয়ে গিয়েছেন, সাফল্য়ের নিরিখে – তাই মাহি অপছন্দের। শেষ বিষয়টা হাস্য়কর লাগলেও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্য়ি। আসলে ওটা ফ্য়ানের ভালোবাসা। আর আবেগ দিয়ে সেই ভালোবাসাটাকে আগলানোর চেষ্টা। প্রিয় ক্রিকেটার অবসর নেওয়ার পর সময়ের সঙ্গে বর্ণহীন হয়ে পড়লেও, ফ্য়ানেরা সহজে নিতে পারেন না। তাই যে মানুষটা তাঁকে ছাপিয়ে গিয়েছে, তাঁকে নিয়ে অকারণে কটু কথা বলা। কারণ, এটা ভারতবর্ষ। তুমি সবচেয়ে সফল, তাই তুমি সবচেয়ে খারাপ মানুষ। বিশ্বের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক হয়েও, তুমি নিন্দিত হবে।
দেখতে দেখতে ২০১৭ সাল প্রায় শেষ লগ্নে এসে পড়ল। দেড় বছর পরেই ২০১৯ সালে ইংল্য়ান্ডে আবার একটা বিশ্বকাপের আসর বসবে। সব দেশের মতো ভারতও তার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। এই চোদ্দো বছরে রাঁচির সেই ছেলেটা এখন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক হয়ে পড়েছেন। টেস্ট আসর থেকে সরে দাঁড়ালেও পঞ্চাশ ওভারের আর টি-২০ ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে দেড় বছর সময়টা ভালো যায়নি বলে অনেকে তাঁকে দল থেকে ছেঁটে ফেলার পক্ষপাতী। অথচ সেই আবেগী মানুষগুলিই আবার কেরিয়ারের পড়ন্ত বেলায় চলে আসা এক ক্রিকেটারকে বারবার সুযোগ দিয়ে যত ইচ্ছে বিশ্বকাপ খেলানোর পক্ষপাতী। কাঁচা-পাকা চুলের ধোনি বুড়োকে তাড়ানো যেতে পারে, তবে তাঁকে কিন্তু বাদ দেওয়া যাবে না।
শ্রীলঙ্কা সিরিজের আগে নির্বাচকরা ধোনিকে কড়া শাসন করার পর অনেকে খুব খুশি হয়েছেন। এতদিনে কেউ বাপ কা বেটা এসেছে, যে ধোনিকে মুখের ওপর বলে দিতে পারে। ঠান্ডার মাথা ধোনি কিন্তু চুপ। কারণ, রাঁচির থেকে ক্রিকেট বিশ্বের চূড়ায় আজ ওটা সম্বল করেই পৌঁছেছেন তিনি। অবাক করার মতো বিষয়, ধোনি কলম্বোয় চতুর্থ ম্য়াচ খেলতে নামার আগে দু’টি বিশ্ব রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে। ষষ্ঠ ভারতীয় হিসেবে তিনশো ওয়ান-ডে ম্য়াচ খেলার গৌরব অর্জন করতে চলেছেন তিনি। ৭২ বার নট-আউট থেকে তালিকায় সবাইকে ছাপিয়ে যেতে আরও একটা অপরাজিত ইনিংস দরকার, ব্য়াস তাহলেই হবে। আবার একটা স্টাম্পিং করলেও ১০০টি স্টাম্পিংয়ের রেকর্ড নিয়ে সবাইকে ছাপিয়ে যাবেন তালিকায়। এত রেকর্ডের মাঝে একটা দিকে তাকাতেই ভুলে গিয়েছেন অনেকে। তিন নম্বরে কেরিয়ার শুরু করা ধোনি আজ একদিনের ক্রিকেটে রান সংগ্রকারীর তালিকায় ভারতীয়দের মধ্য়ে চতুর্থস্থানে। শচীন তেন্ডুলকরের মতো তিনি বিষ্ময় বালক নন, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো তিনি অফ-সাইডের গড নন আবার রাহুল দ্রাবিড়ের মতো দ্য় ওয়াল নিশ্চিতভাবেই নন, তবু মহেন্দ্র সিং ধোনি স্পেশাল। হেলিকপ্টার শটে তিনি বিশ্বজয়করা অধিনায়ক। ২৯৯টি ম্য়াচে ধোনির রান ৯৬০৮। ছ’নম্বরে ব্য়াট করে ১১৫টি ম্য়াচে ৩৭৩৮ রান করেছেন, পাঁচ নম্বরে ৬৭টি ম্য়াচে ২৬৯৩ রান। অধিনায়ক হওয়ার পর দলকে সামলাতে গিয়ে পরের দিকে ব্য়াট করা। নাহলে কেরিয়ারে শুরুতে তিন নম্বরে খেলে ধোনি ১৬ ম্য়াচে ৯৯৩ রান করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর দশটি শতরানের মধ্য়ে দু’টি ওই সময়েই করা। তার মধ্য়ে কেরিয়ারে সেরা ১৮৩ রানটিও রয়েছে। চার নম্বরে খেলতে নেমে ধোনি ২৬টি ম্য়াচে ১২২৩ রান করেছেন। শ্রীলঙ্কা সিরিজে দশহাজার ক্লাবে নাম নাম লেখাতে না পারলেও সামনের মাসে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সেই নজির ছুঁয়ে নেবেন মাহি। আর বিশ্বকাপ পর্যন্ত ধোনি টিমে থাকলে তার আগেই সৌরভ (১১,৩৬৩ রান) ও দ্রাবিড় (১০,৮৮৯ রান)-কে ছাপিয়ে শচীনের (১৮,৪২৬ রান) পরেই ভারতীয় ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা রান সংগ্রহকারীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে চলে আসবেন। অধিনায়ক ধোনি না হয় প্রাক্তন হয়ে গিয়েছেন – কিন্তু, ব্য়াটসম্য়ান ধোনি? উইকেটকিপার ধোনি? এইরকম একটা ক্রিকেটারকে বাদ দিয়ে কি সত্য়িই ভারত বিশ্বকাপ জিততে পারবে? ধোনি একদিন না একদিন অবসর নেবেন, কিন্তু তাঁর পরিবর্ত কি সত্য়ি কোনও দিন খুঁজে পাওয়া যাবে? কারণ লেজেন্ডদের জায়গা নিতে আরেক লেজেন্ড আসেন। কিন্তু তাঁর পরিবর্ত হয়ে নয়, নিজের জায়গা করে নিতে। ভারত যেমন ক্রিকেটবিশ্বকে শাসন করা জন্য় সর্বকালের সেরা ব্য়াটসম্য়ান শচীন তেন্ডুলকর দিয়েছিল, তেমনই বিশ্বক্রিকেটকে সর্বকালের সেরা অধিনায়ক দিয়েছিল। সেসব এখন ইতিহাস। আগামী দিনে উইকেটকিপার-ব্য়াটসম্য়ান ধোনি কেমন খেলেন সেদিকে চোখ রইল…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *